58
সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আধিপত্য বিস্তার, পদ-পদবি, নির্বাচনী মনোনয়ন, স্থানীয় বাজার ও পরিবহনকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার এবং বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় প্রভাবকে কেন্দ্র করে দলের নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে সংঘাত ক্রমেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৩৯ নেতাকর্মী অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও রাজনৈতিক সংঘাতে নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন কয়েক শতাধিক। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের আটজন, কৃষক দলের দুজন, শ্রমিক দলের দুজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের তিনজন, ছাত্রদলের দুজন এবং তাঁতী দলের একজন রয়েছেন।
এই সহিংসতার বড় অংশের পেছনে আদর্শগত রাজনৈতিক বিরোধের চেয়ে স্থানীয় আধিপত্যের প্রশ্নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য থেকে দেখা যায়। কোথাও ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিতে পদ পাওয়া নিয়ে বিরোধ, কোথাও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব, আবার কোথাও বাজার, বাসস্ট্যান্ড কিংবা টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ পেশাদার অপরাধীদের ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তথ্য অনুযায়ী, কাফরুলে এক যুবদল নেতাকে হত্যার জন্য ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে শুটার ভাড়া করার অভিযোগ উঠেছে। পরিকল্পিত হত্যার লক্ষ্য ব্যক্তি বেঁচে গেলেও গুলিতে আরেক যুবদলকর্মী নিহত হন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় অংশ নেওয়া শুটারদের অন্য জেলা থেকে আনা হয়েছিল।
রাজধানীর বাইরে একই ধরনের সংঘাতের চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে। সীতাকুণ্ডে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে যুবদলকর্মী সজিব চৌধুরী নিহত হওয়ার তথ্য এসেছে। ঢাকার মৌচাকে চাঁদার অর্থের ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক এক নেতাকে হত্যা করা হয়। ময়মনসিংহ, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জেও দলীয় বিরোধ, আধিপত্য এবং স্থানীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকার আদাবরে একটি সালিশ বৈঠকও সংঘর্ষে রূপ নেয়। সেখানে ইউনিট বিএনপির এক নেতা নিহত হন এবং আরেক নেতা গুরুতর আহত হন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটির তাৎক্ষণিক কারণ ছিল পূর্ববিরোধ; তবে এর পেছনে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
১৫ আগস্ট পুরান ঢাকার সদরঘাটে দলীয় দুই পক্ষের সংঘর্ষে মিতুল নামে ২০ বছর বয়সী এক তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনাটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার তালিকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি কোতোয়ালি থানার একটি ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী ছিলেন বলে জানা গেছে।
শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়, চলতি বছর দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতার পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ব্যাপ্তি বোঝায়। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে রাজনৈতিক দলীয় কোন্দল ও নির্বাচনী সহিংসতায় সারা দেশে ৫৬ জন নিহত হন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৮৩০টি। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, জামায়াতের ছয়জন এবং অন্যান্য দলের ১১ জন ছিলেন। সংগঠনটির হিসাবে, মোট সহিংসতার ৮১ শতাংশের সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ অথবা বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলের সংঘাত জড়িত ছিল।
জুলাইয়েও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। ওই মাসে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং ১৬৪ জনের বেশি আহত হন বলে একই সংগঠন জানিয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৪টি ঘটনায় দুইজন নিহত এবং অন্তত ৪৮ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াত, বিএনপি-এনসিপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংঘর্ষেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ আহত হন।
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে এ ধরনের সহিংসতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। যখন রাজনৈতিক পদ, নির্বাচনী মনোনয়ন কিংবা স্থানীয় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসে, তখন দলীয় রাজনীতি ধীরে ধীরে জনস্বার্থের পরিবর্তে ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, রাজনৈতিক আধিপত্য, পদ-পদবি, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, দখল ও মামলাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা সংঘাতকে সহিংসতায় পরিণত করছে। তাঁর মতে, এর ফলে রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবশ্য বলছে, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সহিংসতার ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তদন্তে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা এবং নিরপরাধ কাউকে মামলায় না জড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক সহিংসতার আরেকটি ঝুঁকি রয়েছে—অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনা ঘটে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখনো ১,৩২০টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে এসএমজি, চায়না রাইফেল ও পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র অপরাধী বা রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের হাতে থাকলে ভবিষ্যতে সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস তাই শুধু সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম মূল্যায়নের সময় নয়; দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্যের সংঘাত যদি দলীয় নেতৃত্ব কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও অন্যান্য নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে ঘিরে সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক জবাবদিহির। একটি দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তখন তার অভ্যন্তরীণ সংঘাত আর কেবল দলীয় সমস্যা থাকে না। সেই সংঘাতের প্রভাব পড়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ওপরও। ফলে আগামী দিনে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে—ক্ষমতার স্থানীয় প্রতিযোগিতাকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা এবং দলীয় পরিচয়কে সহিংসতা বা অপরাধের সুরক্ষা হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা।
নইলে ছয় মাসের এই রক্তাক্ত পরিসংখ্যান কেবল অতীতের হিসাব হয়ে থাকবে না; বরং সামনে আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতের পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।
