বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিসর ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে ‘হঠকারিতা’ হিসেবে চিহ্নিত করার এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে ব্যবহার করা হতে পারে।
আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে এনসিপির অঙ্গসংগঠন ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা ধীরে ধীরে দেখতে পাচ্ছি যে গণতন্ত্র সংকুচিত হচ্ছে এবং কথা বলার পরিসরও ছোট হয়ে আসছে। আমাদের সবাইকে এটি প্রতিহত করতে হবে।’
তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাঁদের নিরপেক্ষভাবে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা অব্যাহত রাখা উচিত। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজ নিজ গণতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করতে হবে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে ‘হঠকারিতা’ হিসেবে অভিহিত করায় সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ। তিনি বলেন, ‘এখন যখন আমরা গণতান্ত্রিকভাবে কোনো আন্দোলন করছি, যখন বলছি যে সরকারকে গ্যাস বা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, তখন সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এটাকে বলা হচ্ছে হঠকারিতা।’
সড়কে বিক্ষোভ করলে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটতে পারে—এমন যুক্তিতে রাস্তায় বসে বিক্ষোভ নিরুৎসাহিত করার পরামর্শেরও বিরোধিতা করেন তিনি। নাহিদ বলেন, ‘রাস্তায় বসে বিক্ষোভ কিন্তু একটা বৈধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পদ্ধতি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কালকে যখন আমি রাস্তায় নামব প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে, তখন বলা হবে আমি বাস ভাঙচুরের জন্য নামছি এবং আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে, মামলা দেওয়া হবে। এই ন্যারেটিভ সরকারের জায়গা থেকে তৈরি করা হচ্ছে।’
সংসদের ভেতরে ও বাইরে কথা বলার অধিকার একটি বিরোধী দলের রয়েছে উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অহিংসভাবে আমি আমার যেকোনো কথা প্রকাশ করতে পারি। সেই জায়গায় আমার কাছে মনে হচ্ছে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে। সেখানে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে আমরা নিরপেক্ষ ভূমিকা চাই।’
অন্তর্বর্তী সরকারে তথ্য মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের সুরক্ষায় প্রস্তাবিত আইনসহ মিডিয়া সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানান। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ওই কমিশন গঠন করেছিল, কিন্তু অন্যান্য সংস্কার প্রস্তাবের মতো কমিশনের অনেক সুপারিশও পরবর্তী সময়ে আলোচনা থেকে হারিয়ে গেছে।
‘আজকের এই কর্মসূচি থেকে আমরা দাবি জানাচ্ছি, এই সরকার যেন সাংবাদিক সুরক্ষা আইনসহ মিডিয়া সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও অন্যান্য ভালো নীতিগুলো বাস্তবায়ন করে।’
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে সাংবাদিকদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদ। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ বলেন, ‘পেশার ঊর্ধ্বে গিয়েই দেশপ্রেম, মানবিকতা ও বিবেকবোধের জায়গা থেকে সাংবাদিকদের অনেকে ভূমিকা পালন করেছেন।’ সাংবাদিকদের তৈরি ডিজিটাল ভিডিও ও নথিপত্র জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাংবাদিকদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া এটি সম্ভব হতো না বলে মনে করেন তিনি।
নাহিদ জানান, গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রায় ছয়জন সাংবাদিক নিহত এবং কয়েকশ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো শরীরে ছররা গুলি বহন করছেন অথবা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ক্ষত নিয়ে আছেন।
তবে ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের কিছু অংশের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। নাহিদ জানান, তার দল ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’ এবং ‘দায়িত্বশীল রাজনীতি’—দুটিই চায়। গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় অবস্থান যা-ই হোক না কেন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর সহিংসতার বিরোধিতা করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত সাংবাদিকদের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া উদ্যোগগুলোও অব্যাহত রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকরা খুব বেশি কিছু চান না। তারা সঠিকভাবে নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে চান। সরকার বা কোনো রাজনৈতিক শক্তিরই এতে বাধা হয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়।’
ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছার ওপর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র নির্ভর করতে পারে না উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হলে গণতন্ত্র টিকে থাকে। আমরা যত বেশি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারব, এ দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন টিকে থাকার সম্ভাবনাও তত বেশি হবে।’