মন চাইলো পুরনো দিনগুলোকে একটু আঁকড়ে ধরতে। আর সেই স্মৃতির টানে চলে গেলাম ডারউইনের সেই টেস্টে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো কত কিছু—মেহেদী হাসান মিরাজের সেই অসাধারণ ক্যাচ, তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরির পর উচ্ছ্বাস, আর মুমিনুল হকের ব্যাটে জয়ের সেই অনবদ্য মুহূর্ত।
কিন্তু যদি ম্যাচটি না দেখে থাকেন, তবুও প্রথমে যাঁর কথা মনে পড়বে, তিনি হাসান মাহমুদ। কারণ, ম্যাচসেরার তালিকায় তাঁর নামটি চিরকালের জন্য লেখা থাকবে। আর যাঁরা ম্যাচটি দেখেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন—উইকেটের পর দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা হাসানের সেই প্রশান্ত মুহূর্ত।
বছর পেরিয়ে গেলে হয়তো জানতে পারবেন হাসান মাহমুদ কতদূর এগিয়েছেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যখন তিনি প্রথম পাঁচ উইকেট শিকার করলেন, তখন তাঁর স্বপ্ন ছিল টেস্ট ক্রিকেটে চারশ থেকে পাঁচশ উইকেট তোলা। এ কথা শুনে কেউ যদি অবিশ্বাসে হাসেন, তাঁকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই। কারণ, বাংলাদেশের কোনো পেসার এখনো শত উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেননি।
হাসান কি সত্যিই চারশ বা পাঁচশ উইকেট পাবেন? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো সময়ের গর্ভে। সম্ভাবনার বিচারে হয়তো তাঁর সফলতার হার নেহাতই কম। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায়—স্বপ্নটা তিনি খুব আন্তরিকভাবে দেখেছেন। মুখরোচক কোনো কথা বলার জন্য বা শিরোনাম হওয়ার জন্য নয়; তিনি তেমন মানুষ নন।
অনেকের কাছেই হাসানের এই উচ্চাশা হয়তো অহংকার বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, তিনি মোটেও সেরকম নন। ব্যাটসম্যানের মন খারাপ হবে ভেবে তিনি উইকেটের পর উল্লাসও করতে চান না!
ইংরেজিতে তাঁর সাক্ষাৎকার দেখে আজকাল অনেকেই মুগ্ধ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হাসান অত্যন্ত মৃদুভাষী। খুব ধীরে ও অল্প অল্প কথা বলেন। কিন্তু তাঁর কথাগুলো এতটাই গুছানো যে ক্রিকেটের প্রতি তাঁর গভীর উপলব্ধি ধরা পড়ে।
ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেন অনেক ক্রিকেটার। কিন্তু হাসান যখন আসেন, হয়তো বড় কোনো শিরোনাম জোগান না, তবু লেখার মতো বিষয়বস্তুর অভাব হয় না। তিনি চমকপ্রদ কিছু বলেন না, কিন্তু তাঁর বিশ্লেষণে খেলার নিখুঁত একটি চিত্র ফুটে ওঠে।
হাসানের ক্যারিয়ারের গতিপথও যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের মতো—শান্ত, স্থির ও ধীরে ধীরে নিজের পথ তৈরি করা। এখন শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, অনেকেই তাঁকে শুধুমাত্র সাদা বলের বোলার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর অভিষেক হয়েছিল ২০২০ সালে টি-টোয়েন্টি দিয়ে। তার মাত্র এক বছরের মাথায় তিনি ওয়ানডে খেলেছেন।
সেসময়ে তাঁর বোলিংয়ে গতি ছিল, ইয়র্কার নিখুঁত ছিল, কিন্তু সঙ্গে ছিল চোটের আশঙ্কাও। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসান নিজের পথ খুঁজে নিয়েছেন। রঙিন পোশাকে খেলার চার বছর পর তিনি অভিষেক করলেন টেস্টে। সেটাও নানা প্রতিকূলতা, চোট ও নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব পেরিয়ে।
আজ হাসানের সমস্ত মনোযোগ টেস্ট ক্রিকেটে। তিনি দুই দিকে সুইং করাতে পারেন, লেংথের ফাঁদ পাততে জানেন, কাউন্টি ক্রিকেটেও খেলতে যান—যেন লাল বলটাই তাঁর প্রাণের সঙ্গী। চোট যতবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তিনি ততবারই ফিরে এসেছেন লাল বলটাকে আরও শক্ত হাতে ধরে রাখার জন্য।
হাসান এখন লাল বল হাতে কী পারেন, তা নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা চলছে। পাকিস্তান ও ভারতের মাটিতে পাঁচ উইকেট পাওয়ার পর থেকে তাঁর নিয়ে আলোচনা ধীরে ধীরে জোরালো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের ড্রেসিংরুমেও তাঁর নাম শোনা যাচ্ছে।
হাসানের ক্রিকেট গল্প কোথায় গিয়ে শেষ হয়, তা কেউ জানে না। কিন্তু যাঁরা ডারউইন টেস্ট দেখেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই মনে রাখবেন—ভবিষ্যতে সবাই হয়তো অনেক কিছু ভুলে যাবে, কিন্তু স্কোরকার্ডে লেখা থাকবে: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের নায়ক হাসান মাহমুদ। একজন পেসার, যাঁকে স্মৃতির পাতায় চিরদিন রেখে যাবে ক্রিকেটপ্রেমীরা।