রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কি দলীয় আনুগত্যের বাইরে যেতে পারবে?
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। সরকার বদলায়, আর তার সঙ্গে বদলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কিংবা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের অবস্থান। এই ধারাবাহিকতা এত দীর্ঘ হয়েছে যে অনেকের কাছে এটি এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক পদ্ধতি বলেই মনে হয়।
কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক সংকট লুকিয়ে আছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবার নতুন করে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সাজাতে হলে প্রতিষ্ঠান আর প্রতিষ্ঠান থাকে না—তা পরিণত হয় ক্ষমতাসীন দলের সম্প্রসারিত কাঠামোয়। তখন যোগ্যতা, পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একজন কর্মকর্তা কোন রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত, কার প্রতি তাঁর আনুগত্য এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই। দল পরিবর্তন হয়েছে বহুবার, সরকার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের সংস্কৃতি বদলায়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম, প্রশাসন কিংবা অন্যান্য সাংবিধানিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইন অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে দিয়েছে। কিন্তু আইন যে ক্ষমতা দিয়েছে, সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে—সেখানেই মূল প্রশ্ন।
কোনো আইনে বলা নেই যে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক না হলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়া যাবে না। কোথাও বলা নেই যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসতে হলে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি আনুগত্য থাকতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বও কোনো দলের রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হওয়ার কথা নয়।
তারপরও বাস্তব রাজনীতিতে এই ধারণাটি বহু বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ক্ষমতায় যে দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও সেই দলের ‘বিশ্বস্ত’ মানুষ থাকবেন।
এটি কেবল নিয়োগের সমস্যা নয়। এর প্রভাব প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর পড়ে।
একজন উপাচার্য যদি মনে করেন তাঁর পদটি মূলত সরকারের রাজনৈতিক আস্থার ফল, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তিনি কতটা স্বাধীন থাকবেন—এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব যদি রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়, তাহলে মুদ্রানীতি, ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ কিংবা আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা কতটা থাকবে?
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। একটি সরকারি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান যদি ক্ষমতাসীন দলের বক্তব্য প্রচারের যন্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে সেটি জনগণের গণমাধ্যম থাকে না; হয়ে ওঠে সরকারের প্রচারমাধ্যম।
এই পরিস্থিতি রাতারাতি তৈরি হয়নি।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখা গেছে। পরবর্তী সরকারগুলোও সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। বরং এক সরকার যে কাঠামো তৈরি করেছে, পরবর্তী সরকার সেটিকে ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের লোক বসানোর জন্য ব্যবহার করেছে।
ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে।
এক দল ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের নিয়োগকে ‘দলীয়করণ’ বলে সমালোচনা করে। ক্ষমতা পাওয়ার পর সেই একই দল আবার নতুন করে নিয়োগ দেয় নিজেদের রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের। পরবর্তী সরকার এসে আবার আগের নিয়োগগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।
অর্থাৎ সমস্যা ব্যক্তি নয়, সমস্যা কাঠামো।
সমস্যা একটি দলের নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির।
এই কারণেই শুধু সরকার পরিবর্তন করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বদলানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি নিয়োগব্যবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁর পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো একইভাবে কাজ করে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা।
যুক্তরাজ্যে সরকার পরিবর্তন হলে পুরো সিভিল সার্ভিস নতুন করে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সাজানো হয় না। কানাডা ও নিউজিল্যান্ডেও পেশাদার পাবলিক সার্ভিস রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতিনির্ধারণ করে, কিন্তু রাষ্ট্রের পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলো সেই নীতিকে দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে।
বাংলাদেশেও এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রথমেই একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো সরকারের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও ক্ষমতাসীন দলের মুখপত্র হওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এগুলো রাষ্ট্রের সম্পদ এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠান।
জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বড় শিক্ষা এখানেই। সেই আন্দোলন কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের দাবি ছিল না। এর গভীরে ছিল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষা। পরবর্তী সময়ে জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের যে রাজনৈতিক ম্যান্ডেট তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে দলীয় নিয়োগের পুরোনো সংস্কৃতির কোনো সামঞ্জস্য নেই।
তাই নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের দাবি যদি সত্যিই রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রকল্পে পরিণত করতে হয়, তাহলে প্রথম কাজগুলোর একটি হওয়া উচিত নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার।
প্রথমত, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের জন্য স্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। একজন প্রার্থী কোন দলের সমর্থক—এটি যেন নিয়োগের প্রধান বিবেচনা না হয়।
দ্বিতীয়ত, যেখানে সম্ভব সেখানে স্বাধীন অনুসন্ধান ও বাছাই কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সেই কমিটিতে শুধু সরকারি কর্মকর্তা নয়, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদেরও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব স্বচ্ছ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা আবেদন করেছেন, তাঁদের যোগ্যতা কী এবং কেন একজনকে নির্বাচিত করা হলো—এসব বিষয়ে ন্যূনতম জনসম্মুখে ব্যাখ্যার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
চতুর্থত, রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় পদ পাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। একইভাবে একটি দল ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের সব নিয়োগ বাতিল করে নিজেদের লোক বসাবে—এই প্রতিশোধমূলক ধারাও বন্ধ করতে হবে।
কারণ একজন দক্ষ কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নয়; তাঁর পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় নিয়োগের সংস্কৃতি শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা কমায় না, এটি সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তাও দেয়—যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বেশি মূল্যবান।
এর ফলে মেধাবীরা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারান। তরুণদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে প্রতিযোগিতা, শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এর প্রভাব আরও গভীর। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক পদ কিংবা উপাচার্য নিয়োগ যদি রাজনৈতিক মেরুকরণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে গবেষণা ও শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষকরা একাডেমিক উৎকর্ষের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ককে ক্যারিয়ারের নিরাপদ পথ হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারেন।
ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব হলো আর্থিক স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার তদারকি এবং মুদ্রানীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা। সেখানে রাজনৈতিক নির্দেশনা যদি পেশাগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাহলে এর খরচ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ নাগরিক ও অর্থনীতিকে।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাই ‘জয়ীর পুরস্কার’ হিসেবে দেখার মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে।
গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন নয়। আসল পরীক্ষা হলো সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্থিতিশীল থাকে।
একটি ভালো রাষ্ট্রে সরকার আসে এবং যায়; প্রতিষ্ঠান থেকে যায়।
একটি দুর্বল রাষ্ট্রে সরকার আসে, তারপর প্রতিষ্ঠানও বদলে যায়।
বাংলাদেশকে প্রথম পথটি বেছে নিতে হবে।
নতুন সরকার যদি পুরোনো রাজনৈতিক নিয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ভিত্তিতে নিয়োগব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, তাহলে সেটি হবে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি বাস্তব অর্জন। কিন্তু যদি পুরোনো ব্যবস্থাই নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে ফিরে আসে, তাহলে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের চরিত্রের মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে না।
জুলাইয়ের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই শুধু কে ক্ষমতায় থাকবে—এটি নয়। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার হবে?
উত্তরটি হওয়া উচিত একটাই—কোনো দলের নয়, জনগণের।
